Deep Sea Explained: গভীর সমুদ্রে সূর্যের আলো ছাড়াই জীবনের রহস্য

Deep Sea-এর অজানা জগৎ, Hydrothermal Vent, Anglerfish, Giant Isopod ও সূর্যের আলো ছাড়াই বেঁচে থাকা প্রাণীদের বিজ্ঞান জানুন।

গভীর সমুদ্রে জীবন: যেখানে সূর্যের আলো নেই, তবুও প্রাণ আছে

১৯৭৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, ইকুয়েডরের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে একদল বিজ্ঞানী এমন কিছু দেখেছিলেন, যা তখনকার জীববিজ্ঞানের মূল নিয়মকেই ভেঙে দিয়েছিল। সমুদ্রের ২.৫ কিলোমিটার গভীরে, যেখানে সূর্যের আলো কখনো পৌঁছায় না, সেখানে তাঁরা খুঁজে পেয়েছিলেন প্রাণীদের এক গোটা শহর। প্রশ্ন হলো—সূর্যের আলো ছাড়া, প্রচণ্ড চাপের মধ্যে, আর খাবারের অভাবের মধ্যেও প্রাণ কীভাবে টিকে থাকে?

Deep-sea exploration scene with a robotic submarine, anglerfish, octopus, and glowing tube worms, featuring Bengali text about the mysterious world beneath the ocean.
Deep Sea: পৃথিবীর সবচেয়ে অজানা ecosystem-এর গল্প।

অ্যালভিন সাবমেরিন আর প্রথম আবিষ্কার

সেদিন অ্যালভিন নামের একটি ছোট সাদা সাবমেরিনে তিনজন মানুষ ছিলেন—একজন পাইলট আর দুজন ভূতত্ত্ববিদ। তাঁরা সমুদ্রের নিচে গরম পানির উৎস, অর্থাৎ হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট (Hydrothermal Vent) খুঁজছিলেন। তাঁদের দলে কোনো সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ছিলেন না, কারণ সে সময় বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, সমুদ্রের গভীরে প্রাণ থাকতে পারে না।

দুই দিন আগে তাঁরা অ্যাঙ্গাস নামের ২ টন ওজনের একটি স্টিলের খাঁচা সমুদ্রে ফেলেছিলেন, যাতে ক্যামেরা আর শক্তিশালী আলো লাগানো ছিল। প্রায় ২.৫ কিলোমিটার গভীরে অ্যাঙ্গাসের আলো জ্বলে ওঠার পর সেন্সরে গরম পানির তাপমাত্রা ধরা পড়ে—প্রথম হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের সন্ধান মেলে। কিন্তু সাবমেরিনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে বিজ্ঞানীরা যা দেখলেন, তা তাঁদের অনুমানের বাইরে ছিল। প্রায় ৫০ মিটার দূরে পাথরের উপর প্রায় এক ফুট লম্বা সাদা ঝিনুক, আর মাটি থেকে গজিয়ে ওঠা লাল টুপিওয়ালা সাদা কীট। এই জায়গাটা মোটেও প্রাণহীন ছিল না—বরং এখানে ছিল সামুদ্রিক প্রাণীদের এক পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র।

সে সময় জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক নিয়ম ছিল—পৃথিবীর প্রতিটি খাদ্যশৃঙ্খল শুরু হয় সূর্য থেকে। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে সূর্যের আলো দিয়ে খাদ্য তৈরি করে, প্রাণীরা সেই উদ্ভিদ খায়। সূর্য না থাকলে খাদ্য থাকবে না, খাদ্য না থাকলে প্রাণও থাকবে না। কিন্তু সেদিন বিজ্ঞানীরা নিজের চোখে দেখলেন, প্রাণের টিকে থাকার জন্য সূর্যের প্রয়োজন নেই। তাঁরা এমন এক জগতের দরজা খুলে দিলেন, যা আমাদের নিজের পৃথিবীতেই থেকে গিয়েছিল অগোচরে।

গভীর সমুদ্র আসলে কী

সাধারণভাবে সমুদ্রের যে অংশ ২০০ মিটারের বেশি গভীর, তাকেই গভীর সমুদ্র (Deep Sea) বলা হয়। এই গভীরতায় সূর্যের আলো কমতে শুরু করে, আর প্রায় ১ কিলোমিটার গভীরতার পর সেখানে সম্পূর্ণ অন্ধকার—আলো একেবারেই পৌঁছায় না।

এই অংশটা পৃথিবীর কোনো ছোটখাটো এলাকা নয়। প্রাণ থাকতে পারে এমন মোট জায়গার (habitat volume) প্রায় ৯৮.৫ শতাংশ দখল করে আছে গভীর সমুদ্র—অর্থাৎ এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাস্তুতন্ত্র। অথচ ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আধুনিক মানদণ্ড অনুযায়ী পৃথিবীর সমুদ্রতলের মাত্র ২৮ শতাংশ মানচিত্রভুক্ত হয়েছে। বাকি ৭০ শতাংশেরও বেশি এখনো ঠিকমতো মানচিত্রায়ণ করা হয়নি। এমনকি চাঁদ বা মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠের চেয়েও আমাদের কাছে সমুদ্রতলের বিস্তারিত মানচিত্র কম আছে।

গভীর সমুদ্রে প্রাণ টিকে থাকা কঠিন করে তোলে মূলত তিনটি বিষয়—প্রচণ্ড চাপ, অন্ধকার, আর খাদ্যের অভাব।

প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও কীভাবে বেঁচে থাকে প্রাণীরা

পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর জায়গা মারিয়ানা খাদের চ্যালেঞ্জার ডিপ, যার গভীরতা প্রায় ১০,৯০০ মিটার। মাউন্ট এভারেস্টকে উল্টো করে এই খাদে বসিয়ে দিলেও চূড়া থেকে সমুদ্রতল পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার ফাঁকা থেকে যাবে। এই গভীরতায় প্রতি বর্গ ইঞ্চি জায়গায় প্রায় ১৬,০০০ পাউন্ড চাপ পড়ে—অর্থাৎ মাথার উপর একসঙ্গে ১০০টি হাতি দাঁড়িয়ে থাকার সমান।

কিন্তু এই বিশাল চাপ তখনই কোনো কিছুকে চূর্ণ করে দেয়, যখন তার ভেতরে বাতাস, গ্যাস বা ফাঁকা জায়গা থাকে। আমাদের ফুসফুস, কান বা সাইনাসে বাতাস থাকে বলেই চাপ সেগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের শরীর প্রায় পুরোপুরি পানি দিয়ে তৈরি, আর পানি সংকুচিত হয় না। তাদের ফুসফুস বা সুইম ব্লাডারও নেই। ফলে চাপ দিয়ে চূর্ণ করার মতো কোনো ফাঁকা জায়গা তাদের শরীরে থাকে না।

হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট আর কেমোসিন্থেসিস: সূর্য ছাড়া খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়া

১৯৭৭ সালের আবিষ্কারের দুই বছর পর, ১৯৭৯ সালে বিজ্ঞানীরা একই জায়গায় ফিরে যান, এবার সঙ্গে নিয়ে যান জীববিজ্ঞানীদের। এই যাত্রাতেই তাঁরা খুঁজে পান বিশালাকার টিউব ওয়ার্ম, যেগুলো প্রায় ২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই কৃমিদের মুখ বা হজম-তন্ত্র কিছুই নেই।

তাহলে এরা খায় কীভাবে? গবেষণায় দেখা গেছে, এই কৃমিদের শরীরে ট্রফোসোম নামের একটি অঙ্গ আছে, যা ব্যাকটেরিয়ায় ভরা। ভেন্ট থেকে নির্গত হাইড্রোজেন সালফাইড, যা বেশিরভাগ প্রাণীর জন্য বিষাক্ত, সেটাই টিউব ওয়ার্মদের প্রধান খাদ্য। তারা রক্তের মাধ্যমে সালফাইড ব্যাকটেরিয়ার কাছে পাঠায়, আর ব্যাকটেরিয়া সেখান থেকে শক্তি তৈরি করে, যা কৃমির খাদ্য হিসেবে কাজ করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় কেমোসিন্থেসিস (Chemosynthesis)—এতে সূর্যের কোনো ভূমিকা নেই। এই ব্যবস্থা এতটাই কার্যকর যে টিউব ওয়ার্মরা এক বছরে প্রায় ৮০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা যেকোনো সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুততম বৃদ্ধির হার বলে মনে করা হয়।

মেরিন স্নো এবং খাদ্যের চরম সংকট

তবে সব প্রাণী তো হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের কাছে থাকে না। বাকিদের খাদ্যের উৎস হলো "মেরিন স্নো"—মৃত অণুজীব, মাছের বর্জ্য আর অন্যান্য প্রাণীর টুকরো, যা তুষারের মতো ধীরে ধীরে সমুদ্রের উপরিভাগ থেকে তলদেশে গিয়ে পড়ে। কিন্তু এই খাদ্যের বেশিরভাগই পথে হারিয়ে যায়। সমুদ্রের উপরিভাগের খাদ্যের মাত্র ০.৫ থেকে ২ শতাংশ গভীর সমুদ্রতলে পৌঁছাতে পারে। এই কারণেই গভীর সমুদ্রকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি খাদ্য-সংকটাপন্ন জায়গা বলা যায়।

এই অভাব প্রাণীদের শরীরে দুই ধরনের অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটায়। প্রথমটি হলো "ডিপ সি জায়ান্টিজম" (Deep Sea Gigantism)—অর্থাৎ কিছু প্রাণী স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বড় আকারে বেড়ে ওঠে। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ জায়ান্ট আইসোপড, যা দেখতে অনেকটা বিশাল পোকার মতো এবং বিড়ালের সমান, প্রায় ২০ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।

যে আইসোপড ১,৮৬৮ দিন না খেয়ে বেঁচে ছিল

২০০৭ সালে মেক্সিকোতে ধরা পড়া একটি জায়ান্ট আইসোপড রাখা হয় জাপানের তোবা অ্যাকুরিয়ামে। শুরুতে সে স্বাভাবিকভাবে খাচ্ছিল, কিন্তু ২০০৯ সালের ২ জানুয়ারি একটি ছোট মাছের টুকরো খাওয়ার পর সে হঠাৎ খাওয়া বন্ধ করে দেয়। তাজা মাছসহ নানা ধরনের খাবার দেওয়া হলেও সে খাবারের দিকে তাকায়ওনি। এক বছর, দুই বছর করে পাঁচ বছর কেটে যায়, তবু সে খায়নি—অথচ সুস্থভাবে অ্যাকুরিয়ামের মধ্যে ঘুরে বেড়াত। ২০১৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু হয়, ততদিনে সে টানা ১,৮৬৮ দিন না খেয়ে কাটিয়েছিল। মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তেও বিজ্ঞানীরা তার খাওয়া বন্ধ করে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাননি। কেউ কেউ মনে করেন এটা বন্দিদশার প্রভাব হতে পারে, তবে আসল কারণ এখনো অজানা।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় (২০২৬ সালে প্রকাশিত) দেখা গেছে, জায়ান্ট আইসোপডের বড় পাকস্থলী অনেকটা খাদ্যভাণ্ডারের মতো কাজ করতে পারে। তাদের বিপাক ক্রিয়া (metabolism) খুবই ধীর, আর ঠান্ডা পরিবেশে তাদের শক্তি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন খাদ্য ছাড়া টিকে থাকতে সাহায্য করে। এই গবেষণা ওই নির্দিষ্ট আইসোপডটি কেন হঠাৎ খাওয়া বন্ধ করেছিল তা ব্যাখ্যা করে না, কিন্তু এটা দেখায় যে জায়ান্ট আইসোপডের পক্ষে বছরের পর বছর না খেয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব।

তিমির মৃতদেহ: গভীর সমুদ্রের লটারি

গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের জন্য খাদ্য নির্দিষ্ট সময়ে আসে না। মাঝেমধ্যে মরা মাছ, স্কুইড বা তিমির দেহ তলদেশে পৌঁছায়, যা তাদের জন্য এক ধরনের খাদ্য-বন্যা। কিন্তু পরের খাবার কখন মিলবে, তা কারও জানা নেই। এই কারণেই জায়ান্ট আইসোপডের মতো প্রাণীদের শারীরবৃত্ত এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে সুযোগ পেলে প্রচুর খেয়ে নেয়, শরীরে জমিয়ে রাখে, তারপর শক্তি খরচ অনেক কমিয়ে দেয়—যাতে দীর্ঘ সময় না খেয়ে টিকে থাকা যায়।

যখন তিমির মতো বড় কোনো প্রাণী মারা যায়, তখন তা গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের জন্য এক ধরনের লটারি জেতার মতো। একটি তিমির দেহ যে পরিমাণ খাদ্য জোগায়, তা মেরিন স্নো হাজার বছরেও দিতে পারে না। তিমির দেহ তলদেশে পৌঁছানোর পর প্রথমে হ্যাগফিশ ও গভীর সমুদ্রের হাঙরের মতো স্ক্যাভেঞ্জাররা নরম মাংস খেতে শুরু করে—এই কাজ শেষ হতে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর লাগতে পারে। এরপর ব্যাকটেরিয়া তিমির হাড় ভাঙতে শুরু করে এবং সালফাইড নির্গত করে—ঠিক যেমনটা হাইড্রোথার্মাল ভেন্টে হয়। এভাবে তিমির কঙ্কালের চারপাশে হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের মতোই একটি ছোট বাস্তুতন্ত্র তৈরি হয়। ২০২২ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, একটি তিমির দেহ এভাবে প্রায় ১০০ বছর ধরে একটি বাস্তুতন্ত্রকে সচল রাখতে পারে।

ওসেড্যাক্স: হাড়-খেকো কৃমি ও তাদের অদ্ভুত প্রজনন

২০০২ সালে মন্টেরি ক্যানিয়নে বিজ্ঞানীরা একটি তিমির কঙ্কাল খুঁজে পান, যার উপর গজিয়ে উঠেছিল এমন এক ধরনের প্রাণী, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। তাদের নাম দেওয়া হয় ওসেড্যাক্স (Osedax), যার অর্থ "হাড়-খেকো"। এই কৃমিগুলো অনেকটা হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের টিউব ওয়ার্মদের মতো—তাদেরও মুখ বা পাকস্থলী নেই। তারা তিমির হাড়ের ভেতর একধরনের শিকড়-ব্যবস্থা তৈরি করে, আর সিম্বায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে হাড়ের চর্বি ও তেল খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, শুরুতে বিজ্ঞানীরা শুধু স্ত্রী ওসেড্যাক্সই খুঁজে পেয়েছিলেন, একটিও পুরুষ নয়। পরে দেখা গেল, পুরুষ ওসেড্যাক্সরা আসলে স্ত্রীদের শরীরের ভেতরেই বাস করে। তারা স্ত্রীদের তুলনায় আকারে এতটাই ছোট যে প্রায় অণুবীক্ষণিক। তারা হাড় খায় না, বৃদ্ধিও পায় না—তাদের একমাত্র কাজ প্রজননের জন্য শুক্রাণু নিঃসরণ করা। একটি স্ত্রী ওসেড্যাক্স তার শরীরে ৬০০-রও বেশি পুরুষ ধারণ করতে পারে।

অ্যাংলারফিশ: পুরুষ যখন স্ত্রীর শরীরেই মিশে যায়

গভীর সমুদ্রের সবচেয়ে পরিচিত প্রাণী সম্ভবত অ্যাংলারফিশ, যার ভয়ানক দাঁত আর মাথার উপর একটি জ্বলজ্বলে অংশ—এস্কা (Esca)—আছে। এই অংশে ফোটো-ব্যাকটেরিয়াম নামের এক ধরনের আলো-উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা অন্ধকারে অ্যাংলারফিশকে জ্বলতে সাহায্য করে। অ্যাংলারফিশ এই ব্যাকটেরিয়াকে আশ্রয় ও খাদ্য দেয়, বিনিময়ে আলো পায়—যা কেবল আলো দেওয়ার জন্যই নয়, অন্ধকারে শিকার আকর্ষণেও কাজে লাগে।

কিন্তু পুরুষ অ্যাংলারফিশের এই এস্কা থাকে না, তারা জ্বলে না। তাহলে পুরুষরা কী করে? তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে হাজার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত অন্ধকার সমুদ্রে একটি স্ত্রী অ্যাংলারফিশ খুঁজে বের করা—যা পরিসংখ্যানগতভাবে প্রায় অসম্ভব। বিবর্তন এই সমস্যার যে সমাধান বের করেছে, তা জীববিজ্ঞানের অন্যতম অদ্ভুত ঘটনা। পুরুষ অ্যাংলারফিশ স্ত্রীকে খুঁজে পেলে তার দাঁত স্ত্রীর শরীরে গেঁথে দেয় এবং আর কখনো ছাড়ে না। ধীরে ধীরে তাদের দুজনের শরীর, এমনকি রক্তসংবহন-তন্ত্রও একসঙ্গে মিশে যায়। এরপর পুরুষটি স্ত্রীর কাছ থেকেই খাদ্য ও পুষ্টি পায়, দেখার প্রয়োজন না থাকায় তার দৃষ্টিশক্তিও নষ্ট হয়ে যায়। বিনিময়ে সে শুধু প্রজননের জন্য শুক্রাণু জোগায়।

দুটি প্রাণীর শরীর এভাবে মিশে যাওয়ার মতো ঘটনা প্রকৃতির আর কোথাও দেখা যায় না। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটা আরও বিস্ময়কর, কারণ মেরুদণ্ডী প্রাণীদের প্রায় ৫০ কোটি বছরের পুরনো একটি প্রতিরোধ-ব্যবস্থা (adaptive immune system) আছে, যা শরীরে ঢোকা যেকোনো বহিরাগত উপাদানকে আক্রমণ করে—মানুষের ক্ষেত্রে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর প্রত্যাখ্যান হওয়ার কারণও এটাই। কিন্তু স্ত্রী অ্যাংলারফিশের প্রতিরোধ-ব্যবস্থা পুরুষকে প্রত্যাখ্যান করে না।

অক্টোপাসের ৫৩ মাসের অপেক্ষা

২০০৭ সালের এপ্রিলে প্রায় ১,৪০০ মিটার গভীরে একটি পাথরের কাছে একটি অক্টোপাসকে দেখা যায়। ৩৮ দিন পর একই জায়গায় ফিরে গবেষকরা দেখেন, সেই অক্টোপাসটি একই পাথরে, তার ডিমগুলোর উপর বসে আছে। এরপর সাড়ে চার বছর ধরে বিজ্ঞানীরা ১৮ বার সেই জায়গায় ফিরে যান, আর প্রতিবারই একই অক্টোপাসকে একই পাথরে ডিমের উপর বসে থাকতে দেখেন। এই পুরো সময়ে অক্টোপাসটিকে একবারও খেতে দেখা যায়নি। ধীরে ধীরে তার শরীরের রং ফ্যাকাশে হয়ে যায়, চোখ নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে, কিন্তু ৫৩ মাস ধরে সে সেখান থেকে নড়েনি। এটাই যেকোনো প্রাণীর মধ্যে ডিমে তা দেওয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সময় বলে জানা যায়। ২০১১ সালের অক্টোবরে বিজ্ঞানীরা ফিরে দেখেন, ডিম ফুটে গেছে এবং অক্টোপাসটি চলে গেছে।

ঠান্ডা পানিতে সবকিছুই ধীর গতিতে চলে বলেই এই ডিমগুলো পরিপক্ব হতে এত সময় লেগেছিল। আর গভীর সমুদ্রে সময় যেন আলাদাভাবে চলে—এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ গ্রিনল্যান্ড হাঙর।

গ্রিনল্যান্ড হাঙর: যে হাঙর বাঁচে প্রায় ৫০০ বছর

গ্রিনল্যান্ড হাঙর উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের ঠান্ডা ও গভীর পানিতে বাস করে, প্রায় অন্ধ এবং অত্যন্ত ধীরগতির—এক শিশুর হামাগুড়ি দেওয়ার গতির চেয়েও ধীরে সাঁতার কাটে, অর্থাৎ একজন স্বাভাবিক মানুষের হাঁটার চেয়েও ধীরে। ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত এই হাঙর সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা ছিল না, বিশেষ করে তারা কতদিন বাঁচে তা নিয়ে।

সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী জুলিয়াস নিয়েলসেন একটি ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেন। হাঙরের চোখের লেন্সের মাঝের অংশ জন্মের সময়ই তৈরি হয়ে যায় এবং সারা জীবন অপরিবর্তিত থাকে। তিনি ২৮টি স্ত্রী হাঙরের চোখ থেকে এই লেন্স বের করে রেডিওকার্বন ডেটিং করেন। এতে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় গ্রিনল্যান্ড হাঙরটির বয়স ছিল প্রায় ৩৯২ বছর, যদিও এই হিসাবে ১২০ বছর কম-বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। অর্থাৎ গ্রিনল্যান্ড হাঙর সম্ভবত ৫০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। আরও অবাক করা তথ্য হলো, এই হাঙর প্রাপ্তবয়স্ক হতে প্রায় ১৫০ বছর সময় নেয়—যেখানে মানুষ প্রাপ্তবয়স্ক হতে সময় নেয় মাত্র ১৮ বছর।

আমরা গভীর সমুদ্রের কতটা দেখেছি

এই যত প্রাণীর কথা এতক্ষণ বলা হলো—টিউব ওয়ার্ম, ওসেড্যাক্স, অ্যাংলারফিশ, অক্টোপাস কিংবা গ্রিনল্যান্ড হাঙর—এগুলো সম্পর্কে আমরা জানি কারণ কেউ না কেউ নিজে সেখানে গিয়ে দেখেছেন। ২০২৫ সালের মে মাসে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৯৫৮ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত মোট ৪৩,৬৮১টি গভীর সমুদ্র অভিযানের তথ্য একত্র করা হয়—প্রতিটি সাবমেরিন, রোবট ও ক্যামেরার রেকর্ড। মানুষ গভীর সমুদ্রতলের কতটুকু পর্যবেক্ষণ করেছে তা হিসাব করে দেখা যায়, তা মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য এক (০.০০১) শতাংশ।

আর্কটিক অভিযান: লোকির দুর্গ ও গভীর সমুদ্রের রোবট হলি

২০২৪ সালে নরওয়ে সরকার তাদের আর্কটিক জলসীমার একটি বড় অংশ গভীর সমুদ্রে খনন (deep sea mining) কাজের জন্য খুলে দেয়, যার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়। বিভিন্ন পিটিশনে বহু মানুষ স্বাক্ষর করার পর নরওয়ে সরকার এই পরিকল্পনা অন্তত ২০২৯ সাল পর্যন্ত স্থগিত করে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, যে এলাকাটি খননের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল, সেটি মানুষ ঠিকমতো পর্যবেক্ষণই করেনি।

সচেতনতা বাড়াতে এবং বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া গড়ে তুলতে গ্রিনপিস সুইডেন, স্পেন, নরওয়ে ও জার্মানির শীর্ষস্থানীয় গবেষকদের নিয়ে একটি গভীর সমুদ্র অভিযান পরিচালনা করে, যাতে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পাই আমিও। নরওয়ের উপকূল থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রে এই গবেষণা জাহাজে আমি গিয়ে দেখি একটি বিশেষ রোবট, নাম হলি (Holly), যা গ্রিনপিস এই অভিযানের জন্য ভাড়া নিয়েছিল। এই রোবটের দুটি রোবোটিক হাত আছে, যার মাথায় ক্লিপ লাগানো, যা দিয়ে সমুদ্রের গভীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করা যায়। এর উচ্চ-রেজল্যুশন ক্যামেরা প্রতিটি দৃশ্য ধারণ করে। এটি প্রায় ৩ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত যেতে পারে, আর এর সব যন্ত্রাংশ উচ্চ চাপ সহ্য করার জন্য পরীক্ষিত।

রোবটটি একা চালানো যায় না, একসঙ্গে তিনজনের প্রয়োজন হয়। আর তাঁরা একে "চালানো" নয়, "ওড়ানো" বলেন—কারণ এটি সমুদ্রতলের সামান্য উপরে ভেসে ভেসে চলে, যাতে তলদেশের কোনো প্রাণীর ক্ষতি না হয়।

জাহাজে গিয়ে আমি হাতে নিয়ে দেখি একটি গভীর সমুদ্রের তারামাছ, যার রং বাতাসের সংস্পর্শে এসেই ফিকে হয়ে গিয়েছিল। সেখানে ছিল একটি তিমির হাড়ও, যা অ্যাম্ফিপড নামের ক্ষুদ্র প্রাণীদের খাওয়ার কারণে অনেকটা রুটির মতো ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল।

কাচের কঙ্কালের স্পঞ্জ ও পরিবেশগত ডিএনএ

জাহাজে থাকা স্পঞ্জ বিশেষজ্ঞ ড. পাকো কার্ডেনাসের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। গভীর সমুদ্রের স্পঞ্জ পৃথিবীর একমাত্র প্রাণী, যাদের কঙ্কাল কাচ দিয়ে তৈরি। মানুষকে কাচ বানাতে উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়, কিন্তু এই স্পঞ্জরা স্বাভাবিকভাবেই এই কাচ তৈরি করে। এদের শরীরে সূক্ষ্ম কাচের কাঁটা থাকে বলে খালি হাতে ধরলে হাতে ব্যথা লাগতে পারে, তাই গ্লাভস পরে ধরতে হয়।

মানুষের শরীরে ব্যাকটেরিয়া মূলত অন্ত্রে সীমাবদ্ধ থাকে, আর শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়লে অসুস্থতা দেখা দেয়। কিন্তু স্পঞ্জের ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া শুধু ভেতরেই থাকে না, বরং কোষের মধ্যে, এমনকি কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতরেও বাস করে। এই দুইয়ের মধ্যে এমন গভীর নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে যে একে ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ।

এই সম্পর্কই বিজ্ঞানীদের জন্য এক বিশেষ সুযোগ তৈরি করে। স্পঞ্জ সবসময় সমুদ্রের পানি ছেঁকে নেয়, আর এই প্রক্রিয়ায় আশপাশে ভাসতে থাকা অন্যান্য প্রাণীর ডিএনএ-র ছোট ছোট টুকরোও তাদের শরীরে জমা হয়। এভাবে একটি স্পঞ্জ পরিণত হয় সেই এলাকার প্রাকৃতিক ডিএনএ-রেকর্ডার-এ। এই পরিবেশগত ডিএনএ (Environmental DNA) বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, কোন কোন প্রাণী সেখানে বাস করত—এমনকি এমন প্রজাতির অস্তিত্বও ধরা পড়ে, যা কোনো ক্যামেরা বা সাবমেরিন কখনো দেখেনি।

এই অভিযানে রোবট হলি যে জায়গায় পৌঁছেছিল, তার নাম লোকির দুর্গ (Loki's Castle)। সেখানে রোবট তার দুই হাত দিয়ে একটি ব্যানার মেলে ধরে, যাতে লেখা ছিল—"বিজ্ঞানের কথা শুনুন"। একে বলা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম প্রতিবাদ-ব্যানার। এই অভিযানে সংগৃহীত তথ্য এবং একশ ঘণ্টারও বেশি ভিডিও ফুটেজ এখন বিজ্ঞানীদের হাতে, যা বিশ্লেষণ করে আগামী মাসগুলোয় নতুন প্রজাতি ও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে।

গভীর সমুদ্র খনন নিয়ে উদ্বেগ

গ্রিনপিসের মতে এই ধরনের অভিযানের মূল উদ্দেশ্য দুটি—প্রথমত, গভীর সমুদ্রে খনন কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা, আর দ্বিতীয়ত, সমুদ্রের কিছু অংশকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা। যে এলাকা এখনো মানুষের চোখেই ঠিকমতো পড়েনি, সেখানে খনন শুরু করার আগেই তা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

শেষ কথা

আমরা সাধারণত সেসব জিনিস রক্ষা করার কথা ভাবি, যা আমরা চোখে দেখেছি—বন, নদী কিংবা পরিচিত প্রাণী। কিন্তু গভীর সমুদ্র এমন এক জগৎ, যা আমরা এখনো ঠিকমতো দেখিইনি। মাত্র কয়েক দশকের গবেষণায় আমরা জেনেছি, সূর্যের আলো ছাড়াও, প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও, আর খাদ্যের চরম অভাবের মধ্যেও প্রাণ তার নিজের পথ খুঁজে নিতে পারে—কখনো রাসায়নিক শক্তি থেকে খাদ্য তৈরি করে, কখনো শরীরকে বিশাল আকারে বাড়িয়ে, কখনো বছরের পর বছর না খেয়ে, আবার কখনো দুটি শরীরকে একসঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই বাস্তুতন্ত্রের যে সামান্য অংশটুকু আমরা এখনো দেখেছি, তা যথেষ্ট প্রমাণ করে যে এখানে এখনো এমন অনেক কিছু লুকিয়ে আছে, যা আমাদের জানা নেই। আমরা তা ভালোভাবে জানার আগেই হারিয়ে ফেলব, নাকি জানার সুযোগ পাব—এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আগামী সময়ের সিদ্ধান্তের ওপর।

Source 

  1. NOAA Ocean Exploration — Deep Ocean / Chemosynthesis
  2. Woods Hole Oceanographic Institution (WHOI) — 1977 Hydrothermal Vent Discovery
  3. NOAA National Ocean Service — Ocean Depth / Challenger Deep
  4. Smithsonian Ocean — Giant Isopod / Anglerfish
  5. NOAA National Ocean Service — Whale Fall
  6. MBARI — Osedax
  7. PLOS ONE — Deep-Sea Octopus
  8. Science Advances — Greenland Shark / Deep-Sea Exploration

Post a Comment